হবিগঞ্জ ০১:১৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
Logo চুনারুঘাটে কৃষকের কাছে ১০ হাজার টাকা চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ বিএনপি নেতা হাবিবের বিরুদ্ধে Logo জকিগঞ্জ বিজিবির অভিযানে ২৪ লাখ টাকার অবৈধ পণ্য জব্দ Logo কানাইঘাট-জৈন্তাপুর সীমান্তে বিজিবির অভিযানে ১৮ লাখ টাকার অবৈধ পণ্য জব্দ Logo বাহুবলে বনবিভাগের অভিযানে আকাশমনি কাঠের ৬ টুকরা গোলকাঠ জব্দ Logo চুনারুঘাট ফটোগ্রাফি সোসাইটির ৯ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন Logo চুনারুঘাটে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল তরুণের, আশঙ্কাজনক দুই বন্ধু Logo সহপরিবারে ওমরাহ হজ্বে গেলেন চুনারুঘাটের ব্রাদার্স ইলেকট্রিকের স্বত্বাধিকারী জহির আহমেদ Logo চুনারুঘাটে বৃহস্পতিবার নাশিদ সন্ধ্যা, অংশ নেবেন জনপ্রিয় শিল্পী ও ক্বারী Logo হবিগঞ্জে এফএন ফাউন্ডেশন ইউকের উদ্যোগে অসহায় ব্যক্তিকে আর্থিক অনুদান Logo মাধবপুরে সরকারি মাঠের গাছ কাটার অভিযোগ অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন

রাধারমণের সমাধিতে ধামাইলের দিন

সকালের আলো তখন ধীরে ধীরে নেমে আসছে কেশবপুর গ্রামে। চারদিকে সবুজের নিস্তব্ধতা। সেই নিস্তব্ধতার মাঝেই যেন ভেসে আসছিল রাধারমণের সুর। দূর থেকে আসা মানুষের পদচারণায় জেগে উঠছিল সমাধি চত্বর। কেউ হাতে ফুল। কেউ কণ্ঠে গান। কেউবা শুধু ভালোবাসা নিয়েই ছুটে এসেছেন।
২৬ মে। ধামাইল দিবস। রাধারমণ স্মরণ দিবস।

সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার কেশবপুর গ্রামে অবস্থিত বৈষ্ণব সাধক, লোককবি ও ধামাইল নৃত্যের প্রবর্তক রাধারমণ দত্ত পুরকায়স্থের সমাধি প্রাঙ্গণ এদিন হয়ে ওঠে এক অন্যরকম মিলনমেলা। উৎসবের। স্মৃতির। সংস্কৃতির।
সকালে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে দিনের কর্মসূচি শুরু করে হবিগঞ্জের সাংস্কৃতিক সংগঠন “ধামালি চুনারুঘাট”।

ফুলে ফুলে ঢেকে যায় সমাধি বেদি। নীরব শ্রদ্ধায় মাথা নত করেন আগত মানুষজন। যেন সবাই নিজ নিজ ভঙ্গিতে স্মরণ করছিলেন সেই মানুষটিকে, যিনি বাংলার লোকসংস্কৃতিকে দিয়েছিলেন ধামাইলের অনন্য সৌন্দর্য।

এরপর শুরু হয় আলোচনা সভা, স্মরণানুষ্ঠান ও রাধারমণের গান। শিল্পীদের কণ্ঠে একের পর এক ভেসে ওঠে কালজয়ী সব সুর। কখনও প্রেম। কখনও ভক্তি। কখনও বিরহ। ধামাইলের তাল আর করতালের ছন্দে মুখর হয়ে ওঠে পুরো সমাধি চত্বর। মনে হচ্ছিল, রাধারমণের গান যেন এখনও এই মাটির বাতাসে বেঁচে আছে।

এ বছর ধামাইল শিল্প ও সংস্কৃতিতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে প্রখ্যাত ধামাইল শিল্পী কুমকুম চন্দকে আজীবন সম্মাননা প্রদান করা হয়। মুহূর্তটি ছিল আবেগঘন। উপস্থিত শিল্পী ও সংস্কৃতিপ্রেমীরা করতালিতে ভরিয়ে তোলেন পুরো আয়োজন।
দিনভর সমাধি প্রাঙ্গণে ছিল নানা সাংস্কৃতিক সংগঠনের উপস্থিতি। ‘হাছনরাজা লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতি পরিষদ’, “বাংলাদেশ ধামাইল উন্নয়ন পরিষদ, কেন্দ্রীয় কমিটি”, ‘রাইবিনোদিনী ধামাইল সংঘ’, ‘কৃষ্ণকলি ধামাইল সংঘ’, ‘মোহিনী ধামাইল সংঘ’ ও ‘বিনোদিনী ধামাইল সংঘ’সহ বিভিন্ন সংগঠন পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানায় রাধারমণকে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ছুটে আসেন জনপ্রিয় ধামাইল শিল্পী, রাধারমণভক্ত ও সংস্কৃতিপ্রেমীরা। কেউ গান করেন। কেউ নাচেন। কেউ স্মৃতিচারণ করেন। আবার কেউ শুধু মুগ্ধ হয়ে দেখেন, কীভাবে একটি লোকজ সংস্কৃতি আজও মানুষের হৃদয়ে এত গভীরভাবে বেঁচে আছে।

এই আয়োজনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের এক নিরলস প্রচেষ্টা। “ধামালি চুনারুঘাট” এর সভাপতি, লোকসংস্কৃতি সংগ্রাহক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক অ্যাডভোকেট মোস্তাক আহাম্মদ বাহার বহুদিন ধরেই ধামাইলকে জাতীয়ভাবে প্রতিষ্ঠার দাবিতে কাজ করে যাচ্ছেন।
তিনি বলেন, “ধামাইল আমাদের সিলেটের ঐতিহ্য। আমাদের আত্মপরিচয়ের অংশ। দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ আজ এখানে এসেছেন। এটি আমাদের জন্য আশার বিষয়। আমরা চাই, সরকারিভাবে ২৬ মে ‘জাতীয় ধামাইল দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হোক।”
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ২৬ মে ‘জাতীয় ধামাইল দিবস’ ঘোষণার দাবিতে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি প্রদান করে “ধামালি চুনারুঘাট”। এর আগে একই বছরের ১৮ মে সংগঠনটি আনুষ্ঠানিকভাবে দিবসটি পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। এরপর থেকেই প্রতিবছর নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালিত হয়ে আসছে “ধামাইল দিবস” ও “রাধারমণ স্মরণ দিবস”।

দিন শেষে সূর্য যখন পশ্চিমে হেলে পড়ে, তখনও সমাধি চত্বরে ভেসে বেড়াচ্ছিল রাধারমণের গান। মনে হচ্ছিল, শত বছর পরও তিনি আছেন। মানুষের কণ্ঠে। মানুষের ভালোবাসায়। ধামাইলের অনন্ত ছন্দে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

খন্দকার আলাউদ্দিন

আপনাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, অনিয়ম, দুর্নীতি, অপরাধ, জনদুর্ভোগ, উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড ও সম্ভাবনার সংবাদ আমাদের জানান।
জনপ্রিয় সংবাদ

চুনারুঘাটে কৃষকের কাছে ১০ হাজার টাকা চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ বিএনপি নেতা হাবিবের বিরুদ্ধে

রাধারমণের সমাধিতে ধামাইলের দিন

আপডেট সময় ১২:৩৪:৩৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩০ মে ২০২৬

সকালের আলো তখন ধীরে ধীরে নেমে আসছে কেশবপুর গ্রামে। চারদিকে সবুজের নিস্তব্ধতা। সেই নিস্তব্ধতার মাঝেই যেন ভেসে আসছিল রাধারমণের সুর। দূর থেকে আসা মানুষের পদচারণায় জেগে উঠছিল সমাধি চত্বর। কেউ হাতে ফুল। কেউ কণ্ঠে গান। কেউবা শুধু ভালোবাসা নিয়েই ছুটে এসেছেন।
২৬ মে। ধামাইল দিবস। রাধারমণ স্মরণ দিবস।

সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার কেশবপুর গ্রামে অবস্থিত বৈষ্ণব সাধক, লোককবি ও ধামাইল নৃত্যের প্রবর্তক রাধারমণ দত্ত পুরকায়স্থের সমাধি প্রাঙ্গণ এদিন হয়ে ওঠে এক অন্যরকম মিলনমেলা। উৎসবের। স্মৃতির। সংস্কৃতির।
সকালে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে দিনের কর্মসূচি শুরু করে হবিগঞ্জের সাংস্কৃতিক সংগঠন “ধামালি চুনারুঘাট”।

ফুলে ফুলে ঢেকে যায় সমাধি বেদি। নীরব শ্রদ্ধায় মাথা নত করেন আগত মানুষজন। যেন সবাই নিজ নিজ ভঙ্গিতে স্মরণ করছিলেন সেই মানুষটিকে, যিনি বাংলার লোকসংস্কৃতিকে দিয়েছিলেন ধামাইলের অনন্য সৌন্দর্য।

এরপর শুরু হয় আলোচনা সভা, স্মরণানুষ্ঠান ও রাধারমণের গান। শিল্পীদের কণ্ঠে একের পর এক ভেসে ওঠে কালজয়ী সব সুর। কখনও প্রেম। কখনও ভক্তি। কখনও বিরহ। ধামাইলের তাল আর করতালের ছন্দে মুখর হয়ে ওঠে পুরো সমাধি চত্বর। মনে হচ্ছিল, রাধারমণের গান যেন এখনও এই মাটির বাতাসে বেঁচে আছে।

এ বছর ধামাইল শিল্প ও সংস্কৃতিতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে প্রখ্যাত ধামাইল শিল্পী কুমকুম চন্দকে আজীবন সম্মাননা প্রদান করা হয়। মুহূর্তটি ছিল আবেগঘন। উপস্থিত শিল্পী ও সংস্কৃতিপ্রেমীরা করতালিতে ভরিয়ে তোলেন পুরো আয়োজন।
দিনভর সমাধি প্রাঙ্গণে ছিল নানা সাংস্কৃতিক সংগঠনের উপস্থিতি। ‘হাছনরাজা লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতি পরিষদ’, “বাংলাদেশ ধামাইল উন্নয়ন পরিষদ, কেন্দ্রীয় কমিটি”, ‘রাইবিনোদিনী ধামাইল সংঘ’, ‘কৃষ্ণকলি ধামাইল সংঘ’, ‘মোহিনী ধামাইল সংঘ’ ও ‘বিনোদিনী ধামাইল সংঘ’সহ বিভিন্ন সংগঠন পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানায় রাধারমণকে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ছুটে আসেন জনপ্রিয় ধামাইল শিল্পী, রাধারমণভক্ত ও সংস্কৃতিপ্রেমীরা। কেউ গান করেন। কেউ নাচেন। কেউ স্মৃতিচারণ করেন। আবার কেউ শুধু মুগ্ধ হয়ে দেখেন, কীভাবে একটি লোকজ সংস্কৃতি আজও মানুষের হৃদয়ে এত গভীরভাবে বেঁচে আছে।

এই আয়োজনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের এক নিরলস প্রচেষ্টা। “ধামালি চুনারুঘাট” এর সভাপতি, লোকসংস্কৃতি সংগ্রাহক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক অ্যাডভোকেট মোস্তাক আহাম্মদ বাহার বহুদিন ধরেই ধামাইলকে জাতীয়ভাবে প্রতিষ্ঠার দাবিতে কাজ করে যাচ্ছেন।
তিনি বলেন, “ধামাইল আমাদের সিলেটের ঐতিহ্য। আমাদের আত্মপরিচয়ের অংশ। দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ আজ এখানে এসেছেন। এটি আমাদের জন্য আশার বিষয়। আমরা চাই, সরকারিভাবে ২৬ মে ‘জাতীয় ধামাইল দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হোক।”
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ২৬ মে ‘জাতীয় ধামাইল দিবস’ ঘোষণার দাবিতে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি প্রদান করে “ধামালি চুনারুঘাট”। এর আগে একই বছরের ১৮ মে সংগঠনটি আনুষ্ঠানিকভাবে দিবসটি পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। এরপর থেকেই প্রতিবছর নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালিত হয়ে আসছে “ধামাইল দিবস” ও “রাধারমণ স্মরণ দিবস”।

দিন শেষে সূর্য যখন পশ্চিমে হেলে পড়ে, তখনও সমাধি চত্বরে ভেসে বেড়াচ্ছিল রাধারমণের গান। মনে হচ্ছিল, শত বছর পরও তিনি আছেন। মানুষের কণ্ঠে। মানুষের ভালোবাসায়। ধামাইলের অনন্ত ছন্দে।