হবিগঞ্জ ০৮:০৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই ২০২৪, ৩ শ্রাবণ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
Logo সৎ প্রশাসকদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা কোথায়? Logo চুনারুঘাটে ৩৯ বছরের বর্ণাঢ্য শিক্ষকতা পেশার অরবিন্দ দত্তের সমাপ্তি Logo ব্যারিস্টার সুমন এমপিকে সংবর্ধনা দিল চুনারুঘাট ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতি Logo চুনারুঘাটে ১৭ কেজি গাঁজা সহ কারবারি গ্রেপ্তার Logo ৪র্থ বারের মতো জেলার শ্রেষ্ঠ হলেন চুনারুঘাট থানার এসআই লিটন রায় Logo ব্যারিস্টার সুমনকে হত্যার পরিকল্পনাকারী সোহাগ গ্রেফতার Logo ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় হত্যা মামলার আসামি জালাল গ্রেপ্তার Logo ব্যারিস্টার সুমনকে হত্যার পরিকল্পনার ঘটনায় সংবাদ সম্মেলন Logo চুনারুঘাটে বঙ্গবন্ধু পরিষদের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হলেন তৌফিক মিয়া তালুকদার Logo ব্যারিস্টার সুমনের হত্যার পরিকল্পনারকারীদের গ্রেফতারে দাবীতে চুনারুঘাটে মাথায় কাফনের কাপড় বেঁধে প্রতিবাদ 

সাম্যের ঈদ চাই !! 

৫৫ বছরের জীবনে শতাধিক ঈদ অভিজ্ঞতায় আমি সমৃদ্ধ। মুসলিম উম্মার জীবনে ঈদ মানে আনন্দ। সম্প্রীতি আর ভালোবাসার মানুষগুলোকে নিয়ে ধর্মীয় ভাব-গম্ভীর পরিবেশে সুখী,দুঃখী,ধনী,গরীব নির্বিশেষে আনন্দকে ভাগাভাগি করে নেয়াই আমার কাছে ঈদ। ঈদকে সামনে রেখে, আলাদা বাজেট হবে। মা, বাবা, ভাই বোন আর স্বজনদের জন্য নতুন জামা কাপড় হবে। আমার শিক্ষার্থী জীবনটি দেখে, যে ভূমিহীন দীনহীন প্রতিবেশী একদিন পুলকিত হতো, তাঁর সাথেও ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি হবে। যে ভাইটি সুবেহ-সাদিকে লাঙ্গল কাঁধে হালের বলদ নিয়ে মাঠে ছুটতো, ঈদকে সামনে রেখে তাঁর মুখেও হাসি ফুটবে!! যদি তাই না হয়, তবে সেটি আবার কিসের ঈদ? দেশে আজ দু’রকম মানুষ। একদল টাকার পাহাড়ে ঘুমায়। আর একদল অর্থাভাবে কপাল চাপড়ায়। সমাজে কপাল চাপড়ানো মানুষরাই এখন সংখ্যাধিক্য। এঁরা দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধগতিতে দিশেহারা হয়ে নীরবে চোখের জল ফেলে। এ মানুষগুলোর চোখের জলের সঙ্গী না হতে পারলে, সাম্যের ঈদ কোথায়?

স্থান কাল ভেদে ঈদ আনন্দের ব্যারোমিটার উঠানামা করে। শৈশবের ঈদ আনন্দ যৌবনে খুঁজে পাইনি। বিবাহিত জীবনে ঈদ যেন কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট। বউ চায় শশুড় বাড়িতে ঈদ করি। আমি চাই ভালোবাসার শৈশবের মাটিতে ফিরে যাই। এই দ্বন্দ্ব সংঘাতে ঈদ আনন্দ তেতো হয়ে যায়। যখন সন্তানের পিতা হই, অনুভূতি ভিন্ন বৈচিত্র্যে রুপ নেয়। আমি চাই, সন্তান আমার প্রিয় মাটিতে প্রিয়জনদের সাথে হেসে খেলে ঈদকে বরণ করবে। স্ত্রী চায়, ঈদ হোক তাঁর প্রিয়জনদের সাথে। শুরু হয় ভাগাভাগি। একবার এদিকে তো অন্যবার সেদিকে। গ্রামে জন্ম, গ্রামের মাটি না ছুঁইলে আমি ঈদ খুঁজে পাই না। নগরের ঈদকে আমার বড় বেশি মেকি মনে হয়। তবুও দাম্পত্য জীবন কে সম্মান জানাতে, এমন কিছু মেকি ঈদও আমার জীবনে এসেছিল। নতুন জামা কাপড়ে বাহ্যিক চাকচিক্য আর মুখে কৃত্রিম  হাসির ছোঁয়া থাকলেও, এসব দিনগুলোতে কখনো মনের ঈদ হয়ে ওঠেনি।

আজ আঠারো বছর, পাশ্চাত্যে থাকি। এখানকার ঈদকে কোন ভাবেই দেশ মাতৃকার ঈদের সাথে তুলনার সুযোগ নেই। এখানে কর্মীর কোন ঈদ বোনাস নেই, গণছুটি নেই! শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাধারণ কর্ম দিবসের ব্যত্যয় ঘটে না । দৈব চক্রে ঈদটা যদি সাপ্তাহিক ছুটির দিনে হয়, আমেজটা হয় ভিন্ন রকম। আর কর্ম দিবসে ঈদ হলে, বিশেষ অনুমতিতে ছুটি নিতে হয়। অনেকে সেই সুযোগটি গ্রহণ করে, আবার কেউবা মনোবেদনাকে সঙ্গী করে কাজে চলে যায়। তবুও!ঈদকে জাগিয়ে রাখতে প্রাণান্তকর চেষ্টা চলে!

সারা শহর জুড়ে বড় বড় ঈদের জামাত হয়। সকাল থেকে নগরের চিত্র পাল্টে যায়। পায়জামা, পাঞ্জাবির মানুষে শহরটি বৈচিত্রময় হয়ে উঠে। দিনভর বাহারি খানাপিনার আয়োজনে ভোজন রসিক বাঙ্গালীদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সন্ধান মিলে। তবুও সব আয়োজনকে আমার মেকি মনে হয়। হাসিমুখে কোলাকুলি হলেও, হৃদয়ের ভালোবাসাটি জেগে উঠে না। সুখে পাশে থাকলেও, দুঃখে পাশে থাকার লোকের বড়ই আকাল। তাই সব আয়োজন যেন, দুঃখকে পেছনে ঠেলে বেঁচে থাকার এক নিরন্তকর প্রচেষ্টা। মনের অনিচ্ছা সত্ত্বেও, এসব প্রচেষ্টার সঙ্গী হতে হয়।

গত কয় বছরে মানুষের আয় ব্যয়ে ভারসাম্য নেই। মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্ব গতিতে জনজীবনে নাভিশ্বাস। একদিকে ট্যাক্সের চাপে জীবন দিশেহারা, অন্যদিকে মর্টগেজের বাড়াবাড়ি। ক্রমবর্ধমান সুদের হার আর ট্যাক্সের আয় দিয়ে সরকার চলে। ঈদকে সামনে রেখে দেশে থাকা আপনজন, প্রবাসীর দিকে চেয়ে থাকে। প্রবাসী তাঁর দৈনন্দিন খরচ আর পরের মাসের মর্টগেজ নিয়ে দিশেহারা। তাই প্রবাসীদের জীবনে ঈদগুলো এখন ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছে। মূল্যস্ফীতির চাপে ক্রমান্বয়ে সেটি আরও বিবর্ণ হচ্ছে। কৃত্রিমতার ছোঁয়ায় আনন্দ আয়োজন হলেও, মনের ঈদ এখন বহুদূর। এমন পরিস্থিতিতেই, ত্যাগের মহিমায় সমুজ্জ্বল ঈদুল আযহা সমাগত।

মানব ইতিহাসের বর্বরোচিত অধ্যায়ে পবিত্র নগরী জেরুজালেম। গাঁজার ভূখণ্ডে মৃত্যুর আর্তনাদ। মানবতার জয়গান গাওয়া বিশ্ব মোড়লের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিনিয়ত ঘটছে ইতিহাসের নিকৃষ্টতম মানবিক বিপর্যয়। তাঁদের এই চরম বিপর্যয়ের দিনেও, প্রতিবেশী মুসলিম মোড়লেরা জেগে উঠে ঈদ আনন্দে। আমার কাছে সেই ঈদকেও মেকি মনে হয়! বাহিরে কৃত্রিম হাসি, হৃদয়ে চাপা কষ্ট!! না, এমন ঈদ আর চাইনা!! সাম্যের ঈদ চাই, ত্যাগের মহিমায় সমুজ্জ্বল   ভালোবাসার ঈদ চাই। শৈশবের সেই ঈদকে আবারও ফিরে পেতে চাই!!

 

লেখক : কলামিস্ট, উন্নয়ন গবেষক ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষক

ই-মেইল : mahssan8691@gmail.com

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

খন্দকার আলাউদ্দিন

হ্যালো, আমি খন্দকার আলাউদ্দিন, আপনাদের চারিপাশের সংবাদ দিয়ে আমাদের সহযোগিতা করুন।
জনপ্রিয় সংবাদ

সৎ প্রশাসকদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা কোথায়?

সাম্যের ঈদ চাই !! 

আপডেট সময় ১২:১৩:০১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৬ জুন ২০২৪

৫৫ বছরের জীবনে শতাধিক ঈদ অভিজ্ঞতায় আমি সমৃদ্ধ। মুসলিম উম্মার জীবনে ঈদ মানে আনন্দ। সম্প্রীতি আর ভালোবাসার মানুষগুলোকে নিয়ে ধর্মীয় ভাব-গম্ভীর পরিবেশে সুখী,দুঃখী,ধনী,গরীব নির্বিশেষে আনন্দকে ভাগাভাগি করে নেয়াই আমার কাছে ঈদ। ঈদকে সামনে রেখে, আলাদা বাজেট হবে। মা, বাবা, ভাই বোন আর স্বজনদের জন্য নতুন জামা কাপড় হবে। আমার শিক্ষার্থী জীবনটি দেখে, যে ভূমিহীন দীনহীন প্রতিবেশী একদিন পুলকিত হতো, তাঁর সাথেও ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি হবে। যে ভাইটি সুবেহ-সাদিকে লাঙ্গল কাঁধে হালের বলদ নিয়ে মাঠে ছুটতো, ঈদকে সামনে রেখে তাঁর মুখেও হাসি ফুটবে!! যদি তাই না হয়, তবে সেটি আবার কিসের ঈদ? দেশে আজ দু’রকম মানুষ। একদল টাকার পাহাড়ে ঘুমায়। আর একদল অর্থাভাবে কপাল চাপড়ায়। সমাজে কপাল চাপড়ানো মানুষরাই এখন সংখ্যাধিক্য। এঁরা দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধগতিতে দিশেহারা হয়ে নীরবে চোখের জল ফেলে। এ মানুষগুলোর চোখের জলের সঙ্গী না হতে পারলে, সাম্যের ঈদ কোথায়?

স্থান কাল ভেদে ঈদ আনন্দের ব্যারোমিটার উঠানামা করে। শৈশবের ঈদ আনন্দ যৌবনে খুঁজে পাইনি। বিবাহিত জীবনে ঈদ যেন কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট। বউ চায় শশুড় বাড়িতে ঈদ করি। আমি চাই ভালোবাসার শৈশবের মাটিতে ফিরে যাই। এই দ্বন্দ্ব সংঘাতে ঈদ আনন্দ তেতো হয়ে যায়। যখন সন্তানের পিতা হই, অনুভূতি ভিন্ন বৈচিত্র্যে রুপ নেয়। আমি চাই, সন্তান আমার প্রিয় মাটিতে প্রিয়জনদের সাথে হেসে খেলে ঈদকে বরণ করবে। স্ত্রী চায়, ঈদ হোক তাঁর প্রিয়জনদের সাথে। শুরু হয় ভাগাভাগি। একবার এদিকে তো অন্যবার সেদিকে। গ্রামে জন্ম, গ্রামের মাটি না ছুঁইলে আমি ঈদ খুঁজে পাই না। নগরের ঈদকে আমার বড় বেশি মেকি মনে হয়। তবুও দাম্পত্য জীবন কে সম্মান জানাতে, এমন কিছু মেকি ঈদও আমার জীবনে এসেছিল। নতুন জামা কাপড়ে বাহ্যিক চাকচিক্য আর মুখে কৃত্রিম  হাসির ছোঁয়া থাকলেও, এসব দিনগুলোতে কখনো মনের ঈদ হয়ে ওঠেনি।

আজ আঠারো বছর, পাশ্চাত্যে থাকি। এখানকার ঈদকে কোন ভাবেই দেশ মাতৃকার ঈদের সাথে তুলনার সুযোগ নেই। এখানে কর্মীর কোন ঈদ বোনাস নেই, গণছুটি নেই! শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাধারণ কর্ম দিবসের ব্যত্যয় ঘটে না । দৈব চক্রে ঈদটা যদি সাপ্তাহিক ছুটির দিনে হয়, আমেজটা হয় ভিন্ন রকম। আর কর্ম দিবসে ঈদ হলে, বিশেষ অনুমতিতে ছুটি নিতে হয়। অনেকে সেই সুযোগটি গ্রহণ করে, আবার কেউবা মনোবেদনাকে সঙ্গী করে কাজে চলে যায়। তবুও!ঈদকে জাগিয়ে রাখতে প্রাণান্তকর চেষ্টা চলে!

সারা শহর জুড়ে বড় বড় ঈদের জামাত হয়। সকাল থেকে নগরের চিত্র পাল্টে যায়। পায়জামা, পাঞ্জাবির মানুষে শহরটি বৈচিত্রময় হয়ে উঠে। দিনভর বাহারি খানাপিনার আয়োজনে ভোজন রসিক বাঙ্গালীদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সন্ধান মিলে। তবুও সব আয়োজনকে আমার মেকি মনে হয়। হাসিমুখে কোলাকুলি হলেও, হৃদয়ের ভালোবাসাটি জেগে উঠে না। সুখে পাশে থাকলেও, দুঃখে পাশে থাকার লোকের বড়ই আকাল। তাই সব আয়োজন যেন, দুঃখকে পেছনে ঠেলে বেঁচে থাকার এক নিরন্তকর প্রচেষ্টা। মনের অনিচ্ছা সত্ত্বেও, এসব প্রচেষ্টার সঙ্গী হতে হয়।

গত কয় বছরে মানুষের আয় ব্যয়ে ভারসাম্য নেই। মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্ব গতিতে জনজীবনে নাভিশ্বাস। একদিকে ট্যাক্সের চাপে জীবন দিশেহারা, অন্যদিকে মর্টগেজের বাড়াবাড়ি। ক্রমবর্ধমান সুদের হার আর ট্যাক্সের আয় দিয়ে সরকার চলে। ঈদকে সামনে রেখে দেশে থাকা আপনজন, প্রবাসীর দিকে চেয়ে থাকে। প্রবাসী তাঁর দৈনন্দিন খরচ আর পরের মাসের মর্টগেজ নিয়ে দিশেহারা। তাই প্রবাসীদের জীবনে ঈদগুলো এখন ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছে। মূল্যস্ফীতির চাপে ক্রমান্বয়ে সেটি আরও বিবর্ণ হচ্ছে। কৃত্রিমতার ছোঁয়ায় আনন্দ আয়োজন হলেও, মনের ঈদ এখন বহুদূর। এমন পরিস্থিতিতেই, ত্যাগের মহিমায় সমুজ্জ্বল ঈদুল আযহা সমাগত।

মানব ইতিহাসের বর্বরোচিত অধ্যায়ে পবিত্র নগরী জেরুজালেম। গাঁজার ভূখণ্ডে মৃত্যুর আর্তনাদ। মানবতার জয়গান গাওয়া বিশ্ব মোড়লের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিনিয়ত ঘটছে ইতিহাসের নিকৃষ্টতম মানবিক বিপর্যয়। তাঁদের এই চরম বিপর্যয়ের দিনেও, প্রতিবেশী মুসলিম মোড়লেরা জেগে উঠে ঈদ আনন্দে। আমার কাছে সেই ঈদকেও মেকি মনে হয়! বাহিরে কৃত্রিম হাসি, হৃদয়ে চাপা কষ্ট!! না, এমন ঈদ আর চাইনা!! সাম্যের ঈদ চাই, ত্যাগের মহিমায় সমুজ্জ্বল   ভালোবাসার ঈদ চাই। শৈশবের সেই ঈদকে আবারও ফিরে পেতে চাই!!

 

লেখক : কলামিস্ট, উন্নয়ন গবেষক ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষক

ই-মেইল : mahssan8691@gmail.com