হবিগঞ্জ ০৩:৪৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৫ মার্চ ২০২৬, ১০ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
Logo চুনারুঘাটে “সমতা ফাউন্ডেশন” এর কমিটি ঘোষণা, উন্নয়নের প্রত্যাশা এলাকাবাসীর Logo সোনাই নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলন বেড়েই চলেছে: প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনায় খোলা চিঠি Logo মাধবপুরে সুরমা চা বাগানে অপহৃত পর্যটক নারী ২ ঘণ্টার মধ্যে উদ্ধার, আটক ১ Logo হবিগঞ্জে নবাগত পুলিশ সুপার তারেক মাহমুদের যোগদান Logo চোলাই মদ বিক্রির দায়ে কথিত সমাজসেবক নিরঞ্জন সাহা ও তার ভাই সস্ত্রীক কারাগারে Logo চুনারুঘাটের কালিশিরিতে লুৎফিয়া মাদানিয়া মডেল হাফিজিয়া মাদ্রাসার পাঠদান শুরু ২৯ মার্চ Logo চুনারুঘাটে ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠিত Logo একতা, শিক্ষা ও উন্নয়ন ভাবনায় ঘরগাঁও গ্রামে ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠিত Logo মানবিক আবেদন: অসহায় রিকশাচালক বাবার আকুতি—বাঁচাতে চান মেয়েকে Logo চুনারুঘাটের নালমুখ বাজারে ঈদুল ফিতর উপলক্ষে শতাধিক গরু জবাই

সমাজ কি অগ্নি স্ফুলিঙ্গের মুখোমুখি? মো: মাহমুদ হাসান

রাজনীতি, অর্থনীতির গতি প্রকৃতির সাথে সামাজিক ভারসাম্যের পারদ উঠানামা করে। এর যে কোনো একটিতে অস্থিরতা সৃষ্টি হলে সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতের পরিমাণ বেশি হলে কৌশল আর পদক্ষেপে সাবধানী হতে হয়। অস্থির মানসিকতা আর আবেগ নির্ভর সিদ্ধান্ত চরম বিপদ ডেকে আনে। রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো স্থিরতা হারালে রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করতে হয়। সংবিধানকে সর্বোচ্চ অবস্থানে রেখে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় নির্মোহ ভূমিকা অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রের নির্লিপ্ততা  আর পক্ষপাত দুষ্ট আচরণ চরম সামাজিক সংকটের জন্ম দেয়। সমস্যা আর সংকট দীর্ঘায়িত হলে, উত্তরণের পথটি রুদ্ধ হয়ে পড়ে। ২৪ এর গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশ কি সে পথেই এগিয়ে যাচ্ছে?

অর্থনৈতিক দৌরাত্ম্য আর দূর্বৃত্তয়ানের কবলে পড়ে পাঁচটি বাণিজ্যিক ব্যাংক মরণ দশার কবলে পড়ে। সরকার রেগুলেটরি অথরিটি হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারিশকে আমলে নিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিলুপ্ত বা মার্জিং করে দেয়। সহায় সম্পদ একিভূত করে সরকারি ব্যবস্থাপনায় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নামে নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি করে। ব্যাংক গুলো বিলুপ্তির প্রাক্কালে অর্থ ব্যবস্থাপনার সর্বোচ্চ পদধারী গভর্ণর মহোদয় বলেছিলেন, কোন গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না। আতঙ্কিত হয়ে অপ্রয়োজনীয় অর্থ উত্তোলন থেকে বিরত থাকতে নাগরিকদের পরামর্শ দিয়েছিলেন।’ বাণিজ্যিক ব্যাংক সমূহের গ্যারান্টার হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জনগণের আমানত রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। গভর্নরের আশ্বাস বাণীতে আস্থা রেখে গ্রাহকরাও অপেক্ষায় ছিলেন। তাহলে আজ গ্রামীণ জনপদ থেকে রাজপথে আহাজারি কেন?

অর্থনীতিতে ‘আস্থা’ শব্দটির ভূমিকা বৈপ্লবিক। বিশ্বাসের সাথে উত্থান পতনের  ব্যারোমিটার উঠানামা করে। আস্থা বা বিশ্বাস নষ্ট হলে খাদের  কিনারে পৌঁছাতে সময় লাগে না। দুঃখজনক নিম্নমুখী বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পথে এগিয়ে যায় ব্যাংকিং আর আর্থিক ব্যবস্থাপনা। আমাদের সমাজে প্রতারণা একটি সামাজিক ব্যাধি। অন্যকে ঠকিয়ে নিজে বিত্তশালী হওয়ার প্রবণতা অতি পূরণো। এককালে প্রতারণার এই কৌশলটি ব্যক্তি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকলেও, হাল আমলে এটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে।

তবে যখন থেকে শিক্ষিত, মেধাবী আর চৌকসরা প্রতারণাকে পেশা হিসেবে বেঁচে নেয়, অর্থ বিত্তের মালিক হয়ে রাজনীতির সংগে মিশে যায়, তখন থেকেই শুরু হয় প্রতারণার প্রাতিষ্ঠানিক সামাজিকীকরণ। আর এমন দুষ্ট চক্রের সামাজিকীকরণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত আর সমাজের খেটে খাওয়া মানুষ। প্রিয় পাঠক, আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে যুব কর্ম সংস্থান সোসাইটির ( যুবক) কথা, যারা প্রায় চার লক্ষ গ্রাহকের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছিল আড়াই হাজার কোটি টাকা, যার সরাসরি প্রভাবে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রায় দেড় কোটি প্রান্তিক মানুষ। এই প্রতারণার অনুসন্ধানে  ২০১০ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ডঃ মোহাম্মদ ফরাসউদ্দীন কে প্রধান করে একটি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন তদন্ত কমিশন, ২০১১ সালে রফিকুল ইসলামকে প্রধান করে  আরও একটি কমিশন গঠন করা হয়েছিল। প্রশাসক নিয়োগ করে বার বার ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের বিষয়টি আলোচিত হলেও আইনি মারপ্যাচ আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আজও সেটি আলোর মূখ দেখেনি।

এমএলএম কোম্পানি আইনের সুযোগ নিয়ে গঠিত ডেসটিনি, ২০০০-২০১২ সালে প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেয় আমজনতার ৫০০০ কোটি টাকা, গ্লোবাল গেইন ইন্টারন্যাশনাল ১৩ হাজার গ্রাহকের কাছ থেকে আত্নসাত করে আড়াইশো কোটি টাকা। ডিজিটালাইজেশনের সুযোগ নিয়ে প্রতারণার প্রাতিষ্ঠানিক সামাজিকীকরণের বর্ধিত সংস্করণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে ই-কমার্স। যার সুযোগ নিয়ে নোভেরা প্রোডাক্টস ৪০ হাজার ডিসট্রিবিউটর নেয়ার নামে হাতিয়ে নিয়েছে ৬০০ কোটি টাকা। ২০ হাজার লোককে চাকুরী দেয়ার কথা বলে লাইফওয়ে বাংলাদেশ লিমিটেড হাতিয়ে নেয় ৭০ কোটি টাকা। ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ এর হাজার হাজার কোটি টাকার প্রতারণার খবরে গগন বিদারী আহাজারিতে রাজপথ উত্তপ্ত হওয়ার ঘটনা তো সবার জানা। প্রতারণার প্রাতিষ্ঠানিকিকরণের এমন অবারিত সুযোগ পৃথিবীর অন্য কোন সমাজে আছে বলে জানা নেই।

ক্ষুব্ধ আর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে শান্ত করার এক অভিনব কৌশল ‘ উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন তদন্ত কমিটি’। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব কমিটির রিপোর্ট কখনো আলোর মুখ দেখে না। রিপোর্ট প্রস্তুত হলেও, কখনো এর সুপারিশ বাস্তবায়ন হয় না। এর মূল কারণ ক্ষমতা কেন্দ্রে অবৈধ বিত্তশালীদের অবারিত হস্তক্ষেপ। এঁরা রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে, মন্ত্রী, এমপি তৈরির কুশীলব হয়ে ওঠে। যাকে তাঁদের প্রয়োজন তাঁকে  ওঠায়, অপছন্দ হলে ঝেঁটিয়ে  বিদায় করে। পতিত সরকারের আমলে ঢাকা ডিটেল এরিয়া প্লান (DAP) নিয়ে এক ভূমি খেকোর হুংকারের সামনে প্রভাবশালী পূর্ত মন্ত্রীর অসহায় দৃশ্য এখনো জনগণের চোখের সামনে ভাসে। এসব দুর্নীতিবাজ বিত্তশালীদের অবারিত ক্ষমতা আজকাল কোন গোপন বিষয় নয়। এদের হস্তক্ষেপে চোরাচালানি এমপি হয়, সৎ মানুষ মনোনয়ন বঞ্চিত হয়। আইন আর নীতি নৈতিকতায় অটল থাকলে মন্ত্রিত্ব চলে যায়। এমন পরিস্থিতিতে জনগণের বিশ্বাসের জায়গাটি থাকার অবকাশ কোথায়?

অতীতে যারা সরকারি বেসরকারি কেলেঙ্কারির শিকার হয়ে অর্থবিত্ত হারিয়েছেন, কোন সরকার তাঁর প্রতিকার করতে সক্ষম হয়নি। সরকার গরম গরম হুঙ্কার দিয়ে জনগণের পক্ষ নিয়ে উদ্ভুত পরিস্থিতিকে সামাল দিয়েছেন। আখেরে নীতি  নির্ধারকদের ভূমিকা নিগৃহীত জনগণের পরিবর্তে, প্রতারক, নীতিহীনদের স্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তৃণমূল থেকে শীর্ষ পর্যায় অবধি ক্ষমতা কাঠামোর  নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছে।

নীতিহীন দূর্বৃত্তরা নানা কৌশলে মানুষকে বিভ্রান্ত করে। সাধারণ মানুষ প্রতারকদের কৌশলের কাছে বারবার পরাজিত হয়। এনজিও বা এমএলএম কোম্পানির নানা প্রতারণার বিপরীতে সাধারণ মানুষ ভেবেছিল, ব্যাংক ব্যবস্থাটি নিরাপদ। দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ, ইসলামী ব্যাংকিং এর প্রতি এক ধরনের বিশ্বাস ও দুর্বলতা নিয়ে এগিয়ে যায়। নব প্রজন্মের পাঁচটি ব্যাংকে গ্রাহক সংখ্যা বিরানব্বই লক্ষ। দ্রুততম সময়ে এতো অধিক সংখ্যক বিনিয়োগকারী আর গ্রাহক তৈরিতে ধর্মাশ্রয় আর কূটকৌশল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অবসর ভোগীর পেনশনের টাকা, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গৃহবধুর সঞ্চয়, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে প্রবাসী শ্রমিকের অমানবিক পরিশ্রমে অর্জিত রেমিটেন্স, সবই রাষ্ট্রযন্ত্রের ছত্রছায়ায় গণরাক্ষসের দল ভক্ষণ করে ফেলেছে।

বিরানব্বই লক্ষ পরিবারের অন্তত চার কোটি মানুষ আজ আহাজারি করছে! কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অতিকথণ আর হেয়ার কাটের মতো সিদ্ধান্তে ভুক্তভোগীরা দিকভ্রান্ত হয়ে উঠছে। সব হারানোর ভয়ে ক্ষুদ্র আর মধ্য পর্যায়ের বিনিয়োগকারীরা চরম মানসিক অশান্তি আর অস্থিরতায় এলোমেলো বকছে। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের অস্বস্তিগুলো সামাজিক সংকটে রূপায়িত হচ্ছে।

২৪ এর অভ্যুত্থান পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিও সামাজিক স্বস্তির অনুকূলে নয়। তরুণদের পরিবর্তনের ডাক জনগণকে মূল্যবোধের স্বপ্ন দেখিয়েছিল। সাম্যের সমাজ, মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা আর সম্প্রীতির কথা বলেছিল। অসহিষ্ণুতার মাত্রাটি কত তীব্র হলে শিক্ষককে গামছা পড়ানো হয়, মানুষকে জ্বলন্ত পুড়িয়ে গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়, তা সহজেই অনুমেয়। রাষ্ট্রের অন্যতম স্তম্ভ গণমাধ্যম। হাজারো প্রতিকূলতা সত্ত্বেও প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার এর মতো  গণমাধ্যম টিকে ছিল, সে প্রতিষ্ঠানগুলোকেও হুঙ্কার দিয়ে প্রকাশ্যে অগ্নি দগ্ধ করা হলো। এই স্বকরুণ দৃশ্য গণমাধ্যমকে সাহসী হওয়ার পরিবর্তে নতজানু হয়ে ঠিকে থাকার নীতি গ্রহণ করতে হলো।

যে তরুণরা ভবিষ্যতের পথ দেখাবে, তাঁদের স্লোগান আর বক্তব্যের ভাষা শুনলে বনের বানর লজ্জা পাবে!! শিক্ষাঙ্গনে এমন অশ্লীলতা আর অসহিষ্ণুতার সয়লাব নিয়ন্ত্রণের কোনো প্রচেষ্টাও দিক নির্দেশক রাজনৈতিক দলগুলোর এজেন্ডাতে নেই। ক্ষমতার পট-পরিবর্তনে আইনের প্রয়োগ বদলে যায়, এমন সমাজ পৃথিবীর কোন দেশে আছে? আজ যিনি চোর, কাল তিনি সাধু। সুফি,-সাধক, অলি আউলিয়ার সুফিবাদি ইসলাম বাঙালি মুসলমানদের বিকাশে যে দায়িত্ব পালন করেছিল, সেটিও যেন আজ বিলুপ্ত হতে চলেছে।

সবাই ক্ষমতা চায়। যে কোন মূল্যে ক্ষমতাই যেন সমাধান। মাত্র বছর খানেক আগে দুর্নীতি, দুঃশাসন আর স্বৈরতন্ত্রের বিপরীতে একদল তরুণ  জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। বিকল্পধারা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে নতুন সমাজের স্বপ্ন দেখিয়েছিল।  জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে তাঁদের পদ ভাগাভাগির লীলা খেলা দেখে জাতির চক্ষু আজ চরক গাছ। রাজনীতির রোষানলেও কোটি মানুষের ঘরে অশান্তির দাবানল। কোটি কোটি আমানতকারী দিশেহারা, অর্থনীতি সাঁতার কাটছে গহীন সাগরে, রাজনীতিবিদরা নীতিহীন কাজ কারবারে ব্যতিব্যস্ত, শিক্ষাঙ্গন লক্ষ্যহীন। ঋণের বোঝা। এটি নাকি আর টানার উপায় নাই। দেড় বছরে দশ গুণ!!

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম!! এতো যেন চরিত্র হনন, লাম্পট্য, মিথ্যাচার, প্রোপাগান্ডা আর প্রতিশোধ প্রতিহিংসার এক মহাকাব্য। বাঙালি সমাজের ফেসবুকিয় চিত্র দেখলে, স্বয়ং মার্ক জুকারবার্গও হয়তো আতঙ্কে শিহরিত হতেন। সমস্যা সংকটের এতো যানজটেও আগ্রাসনবাদী শক্তির চুক্তির মহরত থেমে নেই। দু’সপ্তাহ পরে নির্বাচন। এখনো বিশ্ব আগ্রাসনবাদীদের চুক্তির মহরৎ হয় পাঁচ তারকা হোটেলে। চারিদিকে দাবানল!! পূর্ব-পশ্চিমে, উত্তর-দক্ষিনে স্বার্থবাদীদের মহড়া! প্রাচ্য, পাশ্চাত্য সবার লক্ষ্য আমাদের ব-দ্বীপ। এমন পরিস্থিতিতে, সমাজ কি তবে আরেকটি অগ্নিস্ফুলিঙ্গের পথেই এগিয়ে যাচ্ছে?

লেখক: কলামিস্ট ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষক

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

খন্দকার আলাউদ্দিন

হ্যালো, আমি খন্দকার আলাউদ্দিন, আপনাদের চার পাশের সংবাদ দিয়ে আমাদের সহযোগিতা করুন।
জনপ্রিয় সংবাদ

চুনারুঘাটে “সমতা ফাউন্ডেশন” এর কমিটি ঘোষণা, উন্নয়নের প্রত্যাশা এলাকাবাসীর

সমাজ কি অগ্নি স্ফুলিঙ্গের মুখোমুখি? মো: মাহমুদ হাসান

আপডেট সময় ০৪:২৫:১২ অপরাহ্ন, সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

রাজনীতি, অর্থনীতির গতি প্রকৃতির সাথে সামাজিক ভারসাম্যের পারদ উঠানামা করে। এর যে কোনো একটিতে অস্থিরতা সৃষ্টি হলে সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতের পরিমাণ বেশি হলে কৌশল আর পদক্ষেপে সাবধানী হতে হয়। অস্থির মানসিকতা আর আবেগ নির্ভর সিদ্ধান্ত চরম বিপদ ডেকে আনে। রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো স্থিরতা হারালে রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করতে হয়। সংবিধানকে সর্বোচ্চ অবস্থানে রেখে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় নির্মোহ ভূমিকা অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রের নির্লিপ্ততা  আর পক্ষপাত দুষ্ট আচরণ চরম সামাজিক সংকটের জন্ম দেয়। সমস্যা আর সংকট দীর্ঘায়িত হলে, উত্তরণের পথটি রুদ্ধ হয়ে পড়ে। ২৪ এর গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশ কি সে পথেই এগিয়ে যাচ্ছে?

অর্থনৈতিক দৌরাত্ম্য আর দূর্বৃত্তয়ানের কবলে পড়ে পাঁচটি বাণিজ্যিক ব্যাংক মরণ দশার কবলে পড়ে। সরকার রেগুলেটরি অথরিটি হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারিশকে আমলে নিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিলুপ্ত বা মার্জিং করে দেয়। সহায় সম্পদ একিভূত করে সরকারি ব্যবস্থাপনায় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নামে নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি করে। ব্যাংক গুলো বিলুপ্তির প্রাক্কালে অর্থ ব্যবস্থাপনার সর্বোচ্চ পদধারী গভর্ণর মহোদয় বলেছিলেন, কোন গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না। আতঙ্কিত হয়ে অপ্রয়োজনীয় অর্থ উত্তোলন থেকে বিরত থাকতে নাগরিকদের পরামর্শ দিয়েছিলেন।’ বাণিজ্যিক ব্যাংক সমূহের গ্যারান্টার হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জনগণের আমানত রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। গভর্নরের আশ্বাস বাণীতে আস্থা রেখে গ্রাহকরাও অপেক্ষায় ছিলেন। তাহলে আজ গ্রামীণ জনপদ থেকে রাজপথে আহাজারি কেন?

অর্থনীতিতে ‘আস্থা’ শব্দটির ভূমিকা বৈপ্লবিক। বিশ্বাসের সাথে উত্থান পতনের  ব্যারোমিটার উঠানামা করে। আস্থা বা বিশ্বাস নষ্ট হলে খাদের  কিনারে পৌঁছাতে সময় লাগে না। দুঃখজনক নিম্নমুখী বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পথে এগিয়ে যায় ব্যাংকিং আর আর্থিক ব্যবস্থাপনা। আমাদের সমাজে প্রতারণা একটি সামাজিক ব্যাধি। অন্যকে ঠকিয়ে নিজে বিত্তশালী হওয়ার প্রবণতা অতি পূরণো। এককালে প্রতারণার এই কৌশলটি ব্যক্তি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকলেও, হাল আমলে এটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে।

তবে যখন থেকে শিক্ষিত, মেধাবী আর চৌকসরা প্রতারণাকে পেশা হিসেবে বেঁচে নেয়, অর্থ বিত্তের মালিক হয়ে রাজনীতির সংগে মিশে যায়, তখন থেকেই শুরু হয় প্রতারণার প্রাতিষ্ঠানিক সামাজিকীকরণ। আর এমন দুষ্ট চক্রের সামাজিকীকরণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত আর সমাজের খেটে খাওয়া মানুষ। প্রিয় পাঠক, আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে যুব কর্ম সংস্থান সোসাইটির ( যুবক) কথা, যারা প্রায় চার লক্ষ গ্রাহকের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছিল আড়াই হাজার কোটি টাকা, যার সরাসরি প্রভাবে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রায় দেড় কোটি প্রান্তিক মানুষ। এই প্রতারণার অনুসন্ধানে  ২০১০ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ডঃ মোহাম্মদ ফরাসউদ্দীন কে প্রধান করে একটি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন তদন্ত কমিশন, ২০১১ সালে রফিকুল ইসলামকে প্রধান করে  আরও একটি কমিশন গঠন করা হয়েছিল। প্রশাসক নিয়োগ করে বার বার ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের বিষয়টি আলোচিত হলেও আইনি মারপ্যাচ আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আজও সেটি আলোর মূখ দেখেনি।

এমএলএম কোম্পানি আইনের সুযোগ নিয়ে গঠিত ডেসটিনি, ২০০০-২০১২ সালে প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেয় আমজনতার ৫০০০ কোটি টাকা, গ্লোবাল গেইন ইন্টারন্যাশনাল ১৩ হাজার গ্রাহকের কাছ থেকে আত্নসাত করে আড়াইশো কোটি টাকা। ডিজিটালাইজেশনের সুযোগ নিয়ে প্রতারণার প্রাতিষ্ঠানিক সামাজিকীকরণের বর্ধিত সংস্করণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে ই-কমার্স। যার সুযোগ নিয়ে নোভেরা প্রোডাক্টস ৪০ হাজার ডিসট্রিবিউটর নেয়ার নামে হাতিয়ে নিয়েছে ৬০০ কোটি টাকা। ২০ হাজার লোককে চাকুরী দেয়ার কথা বলে লাইফওয়ে বাংলাদেশ লিমিটেড হাতিয়ে নেয় ৭০ কোটি টাকা। ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ এর হাজার হাজার কোটি টাকার প্রতারণার খবরে গগন বিদারী আহাজারিতে রাজপথ উত্তপ্ত হওয়ার ঘটনা তো সবার জানা। প্রতারণার প্রাতিষ্ঠানিকিকরণের এমন অবারিত সুযোগ পৃথিবীর অন্য কোন সমাজে আছে বলে জানা নেই।

ক্ষুব্ধ আর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে শান্ত করার এক অভিনব কৌশল ‘ উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন তদন্ত কমিটি’। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব কমিটির রিপোর্ট কখনো আলোর মুখ দেখে না। রিপোর্ট প্রস্তুত হলেও, কখনো এর সুপারিশ বাস্তবায়ন হয় না। এর মূল কারণ ক্ষমতা কেন্দ্রে অবৈধ বিত্তশালীদের অবারিত হস্তক্ষেপ। এঁরা রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে, মন্ত্রী, এমপি তৈরির কুশীলব হয়ে ওঠে। যাকে তাঁদের প্রয়োজন তাঁকে  ওঠায়, অপছন্দ হলে ঝেঁটিয়ে  বিদায় করে। পতিত সরকারের আমলে ঢাকা ডিটেল এরিয়া প্লান (DAP) নিয়ে এক ভূমি খেকোর হুংকারের সামনে প্রভাবশালী পূর্ত মন্ত্রীর অসহায় দৃশ্য এখনো জনগণের চোখের সামনে ভাসে। এসব দুর্নীতিবাজ বিত্তশালীদের অবারিত ক্ষমতা আজকাল কোন গোপন বিষয় নয়। এদের হস্তক্ষেপে চোরাচালানি এমপি হয়, সৎ মানুষ মনোনয়ন বঞ্চিত হয়। আইন আর নীতি নৈতিকতায় অটল থাকলে মন্ত্রিত্ব চলে যায়। এমন পরিস্থিতিতে জনগণের বিশ্বাসের জায়গাটি থাকার অবকাশ কোথায়?

অতীতে যারা সরকারি বেসরকারি কেলেঙ্কারির শিকার হয়ে অর্থবিত্ত হারিয়েছেন, কোন সরকার তাঁর প্রতিকার করতে সক্ষম হয়নি। সরকার গরম গরম হুঙ্কার দিয়ে জনগণের পক্ষ নিয়ে উদ্ভুত পরিস্থিতিকে সামাল দিয়েছেন। আখেরে নীতি  নির্ধারকদের ভূমিকা নিগৃহীত জনগণের পরিবর্তে, প্রতারক, নীতিহীনদের স্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তৃণমূল থেকে শীর্ষ পর্যায় অবধি ক্ষমতা কাঠামোর  নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছে।

নীতিহীন দূর্বৃত্তরা নানা কৌশলে মানুষকে বিভ্রান্ত করে। সাধারণ মানুষ প্রতারকদের কৌশলের কাছে বারবার পরাজিত হয়। এনজিও বা এমএলএম কোম্পানির নানা প্রতারণার বিপরীতে সাধারণ মানুষ ভেবেছিল, ব্যাংক ব্যবস্থাটি নিরাপদ। দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ, ইসলামী ব্যাংকিং এর প্রতি এক ধরনের বিশ্বাস ও দুর্বলতা নিয়ে এগিয়ে যায়। নব প্রজন্মের পাঁচটি ব্যাংকে গ্রাহক সংখ্যা বিরানব্বই লক্ষ। দ্রুততম সময়ে এতো অধিক সংখ্যক বিনিয়োগকারী আর গ্রাহক তৈরিতে ধর্মাশ্রয় আর কূটকৌশল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অবসর ভোগীর পেনশনের টাকা, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গৃহবধুর সঞ্চয়, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে প্রবাসী শ্রমিকের অমানবিক পরিশ্রমে অর্জিত রেমিটেন্স, সবই রাষ্ট্রযন্ত্রের ছত্রছায়ায় গণরাক্ষসের দল ভক্ষণ করে ফেলেছে।

বিরানব্বই লক্ষ পরিবারের অন্তত চার কোটি মানুষ আজ আহাজারি করছে! কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অতিকথণ আর হেয়ার কাটের মতো সিদ্ধান্তে ভুক্তভোগীরা দিকভ্রান্ত হয়ে উঠছে। সব হারানোর ভয়ে ক্ষুদ্র আর মধ্য পর্যায়ের বিনিয়োগকারীরা চরম মানসিক অশান্তি আর অস্থিরতায় এলোমেলো বকছে। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের অস্বস্তিগুলো সামাজিক সংকটে রূপায়িত হচ্ছে।

২৪ এর অভ্যুত্থান পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিও সামাজিক স্বস্তির অনুকূলে নয়। তরুণদের পরিবর্তনের ডাক জনগণকে মূল্যবোধের স্বপ্ন দেখিয়েছিল। সাম্যের সমাজ, মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা আর সম্প্রীতির কথা বলেছিল। অসহিষ্ণুতার মাত্রাটি কত তীব্র হলে শিক্ষককে গামছা পড়ানো হয়, মানুষকে জ্বলন্ত পুড়িয়ে গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়, তা সহজেই অনুমেয়। রাষ্ট্রের অন্যতম স্তম্ভ গণমাধ্যম। হাজারো প্রতিকূলতা সত্ত্বেও প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার এর মতো  গণমাধ্যম টিকে ছিল, সে প্রতিষ্ঠানগুলোকেও হুঙ্কার দিয়ে প্রকাশ্যে অগ্নি দগ্ধ করা হলো। এই স্বকরুণ দৃশ্য গণমাধ্যমকে সাহসী হওয়ার পরিবর্তে নতজানু হয়ে ঠিকে থাকার নীতি গ্রহণ করতে হলো।

যে তরুণরা ভবিষ্যতের পথ দেখাবে, তাঁদের স্লোগান আর বক্তব্যের ভাষা শুনলে বনের বানর লজ্জা পাবে!! শিক্ষাঙ্গনে এমন অশ্লীলতা আর অসহিষ্ণুতার সয়লাব নিয়ন্ত্রণের কোনো প্রচেষ্টাও দিক নির্দেশক রাজনৈতিক দলগুলোর এজেন্ডাতে নেই। ক্ষমতার পট-পরিবর্তনে আইনের প্রয়োগ বদলে যায়, এমন সমাজ পৃথিবীর কোন দেশে আছে? আজ যিনি চোর, কাল তিনি সাধু। সুফি,-সাধক, অলি আউলিয়ার সুফিবাদি ইসলাম বাঙালি মুসলমানদের বিকাশে যে দায়িত্ব পালন করেছিল, সেটিও যেন আজ বিলুপ্ত হতে চলেছে।

সবাই ক্ষমতা চায়। যে কোন মূল্যে ক্ষমতাই যেন সমাধান। মাত্র বছর খানেক আগে দুর্নীতি, দুঃশাসন আর স্বৈরতন্ত্রের বিপরীতে একদল তরুণ  জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। বিকল্পধারা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে নতুন সমাজের স্বপ্ন দেখিয়েছিল।  জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে তাঁদের পদ ভাগাভাগির লীলা খেলা দেখে জাতির চক্ষু আজ চরক গাছ। রাজনীতির রোষানলেও কোটি মানুষের ঘরে অশান্তির দাবানল। কোটি কোটি আমানতকারী দিশেহারা, অর্থনীতি সাঁতার কাটছে গহীন সাগরে, রাজনীতিবিদরা নীতিহীন কাজ কারবারে ব্যতিব্যস্ত, শিক্ষাঙ্গন লক্ষ্যহীন। ঋণের বোঝা। এটি নাকি আর টানার উপায় নাই। দেড় বছরে দশ গুণ!!

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম!! এতো যেন চরিত্র হনন, লাম্পট্য, মিথ্যাচার, প্রোপাগান্ডা আর প্রতিশোধ প্রতিহিংসার এক মহাকাব্য। বাঙালি সমাজের ফেসবুকিয় চিত্র দেখলে, স্বয়ং মার্ক জুকারবার্গও হয়তো আতঙ্কে শিহরিত হতেন। সমস্যা সংকটের এতো যানজটেও আগ্রাসনবাদী শক্তির চুক্তির মহরত থেমে নেই। দু’সপ্তাহ পরে নির্বাচন। এখনো বিশ্ব আগ্রাসনবাদীদের চুক্তির মহরৎ হয় পাঁচ তারকা হোটেলে। চারিদিকে দাবানল!! পূর্ব-পশ্চিমে, উত্তর-দক্ষিনে স্বার্থবাদীদের মহড়া! প্রাচ্য, পাশ্চাত্য সবার লক্ষ্য আমাদের ব-দ্বীপ। এমন পরিস্থিতিতে, সমাজ কি তবে আরেকটি অগ্নিস্ফুলিঙ্গের পথেই এগিয়ে যাচ্ছে?

লেখক: কলামিস্ট ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষক