জাতীয় পর্যায়ের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘পেইজ ডেভেলপমেন্ট সেন্টার’-এর হবিগঞ্জ এরিয়া ম্যানেজার মো. জাহাঙ্গীর-এর বিরুদ্ধে ঘুষ, অসদাচরণ, নারী কর্মীদের হয়রানি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষানবিশ মাঠকর্মীদের চাকরি স্থায়ী করতে হলে এরিয়া ম্যানেজারকে ১০ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়। ঘুষ না দিলে মাসের পর মাস চাকরি স্থায়ীকরণ আটকে রাখা হয়, এমনকি গালিগালাজ ও হুমকিরও শিকার হতে হয় কর্মীদের।
পিকেএসএফ-এর সহায়তায় পরিচালিত পেইজ ডেভেলপমেন্ট সেন্টার দেশের ১৭টি জেলায় ১৮০টিরও বেশি শাখার মাধ্যমে বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে আসছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির হবিগঞ্জ অঞ্চলে কর্মরত একাধিক বর্তমান ও সাবেক মাঠকর্মী অভিযোগ করেছেন, এরিয়া ম্যানেজার মো. জাহাঙ্গীরের অনিয়ম-দুর্নীতি ও অসদাচরণের কারণে কর্মপরিবেশ দিন দিন অসহনীয় হয়ে উঠছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক শিক্ষানবিশ মাঠকর্মী জানান, চাকরির ছয় মাস পূর্ণ হলেই স্থায়ীকরণের জন্য এরিয়া ম্যানেজার জাহাঙ্গীর ১০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন। যারা টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানায়, তাদের সঙ্গে তিনি দুর্ব্যবহার করেন, অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং চাকরি থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দেন। ফলে ছয় মাসে স্থায়ী হওয়ার কথা থাকলেও অনেকের চাকরি ১০ মাসেও স্থায়ী করা হয় না।
অভিযোগ রয়েছে, নারী মাঠকর্মীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। কয়েকজন সাবেক কর্মী অভিযোগ করেন, জাহাঙ্গীর নারী কর্মীদের সঙ্গে অশালীন ও যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কথাবার্তা বলতেন। এমনকি রাতে মোবাইলে ভিডিও কল দিতেন। কেউ ফোন রিসিভ না করলে পরদিন অফিসে গিয়ে হুমকি ও গালিগালাজ করতেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
মাধবপুর শাখার সাবেক মাঠকর্মী ইয়াসমিন আক্তার জানান, তিনি প্রায় দেড় বছর চাকরি করেছেন। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে চাকরি ছাড়েন। তার ভাষ্য, শিক্ষানবিশ সময় শেষ হওয়ার পর চাকরি স্থায়ী করতে বাধ্য হয়ে জাহাঙ্গীরকে ১০ হাজার টাকা দিতে হয়েছিল। তিনি আরও অভিযোগ করেন, মাধবপুর শাখা ম্যানেজার আবুল হাসানও এই ঘুষ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। তাদের দু’জনের অন্যায় আচরণ, চাপ ও অপমান সহ্য করতে না পেরে অনেক মাঠকর্মী চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন।
বাহুবল শাখায় ফিল্ড অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন মোহাম্মদ রোমন। তিনি জানান, চাকরি স্থায়ী করার সময় তাকেও ১০ হাজার টাকা দিতে হয়েছিল। পরে কোনো এক কারণে সেই টাকা জাহাঙ্গীর ফেরত দিতে বাধ্য হন। জাহাঙ্গীরের আচরণ ও অত্যাচারে বছরখানেকের মাথায় তাকেও চাকরি ছেড়ে দিতে হয়েছে বলে জানান তিনি।
মাধবপুর শাখার আরেক সাবেক মাঠকর্মী রেজুয়ানা আক্তার অভিযোগ করেন, এরিয়া ম্যানেজার জাহাঙ্গীর ও শাখা ম্যানেজার আবুল হাসানের গালিগালাজ ও অশোভন আচরণের কারণে তিনি আড়াই মাসের বেশি চাকরি করতে পারেননি।
শুধু কর্মীরাই নন, স্থানীয়রাও জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলেছেন। কেন্দ্র সদস্য জহুর আলী বলেন, “জাহাঙ্গীরের ব্যবহার খুবই খারাপ। সে নারীলোভী মানুষ। আমার এলাকার দুইটি মেয়ে পেইজে চাকরির জন্য আবেদন করে কুমিল্লায় পরীক্ষা দিতে গিয়েছিল। সেই সুযোগে জাহাঙ্গীর আমার মাধ্যমে তাদের কাছেও চাকরি দেওয়ার নামে ঘুষ চেয়েছিল।”
সংস্থাটির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এরিয়া ম্যানেজার জাহাঙ্গীর নিজেকে প্রতিষ্ঠানের ডেপুটি ডিরেক্টর মো. শাহাজাহান-এর ভাতিজা পরিচয় দিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করেন। তার এমন আচরণে সংস্থার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। ওই কর্মকর্তা বলেন, “জাহাঙ্গীরকে মাঠপর্যায়ের দায়িত্ব থেকে না সরালে প্রতিষ্ঠানের মান-সম্মান আরও নষ্ট হবে।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পেইজের হবিগঞ্জ এরিয়া ম্যানেজার মো. জাহাঙ্গীর ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে তিনি স্বীকার করেন, কর্মীদের সঙ্গে কখনও কখনও “গরম হয়ে” কথা বলতে হয়। তার ভাষ্য, “ঋণ দিয়ে কিস্তি উঠানো খুব কঠিন কাজ। তাই কর্মীদের সঙ্গে একটু গরম হয়ে কথা বলতেই হয়।” তিনি আরও বলেন, শতভাগ কিস্তি আদায় না হওয়ায় হবিগঞ্জ শাখার এক ম্যানেজারকে ডিমোশন দিয়ে অ্যাকাউন্টসের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, একের পর এক গুরুতর অভিযোগ উঠলেও এখনো পর্যন্ত পেইজ ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো দৃশ্যমান তদন্ত বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তা জানা যায়নি। অভিযোগকারীরা দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
স্টাফ রিপোর্টার : 


















