হবিগঞ্জ ০৪:০৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
Logo ‘অবিচল বিশ্বাসের ৫০ বছর’ উদযাপনে হবিগঞ্জে র‍্যালি ও গ্রাহক সম্মেলন Logo চুনারুঘাট থানায় ১২ দিনে প্রত্যাহার ৪ পুলিশ সদস্য Logo তরুণ আলোকচিত্রী মারুফের ‘বোটানিক্যাল সাইলেন্স’, প্রকৃতির সৌন্দর্যে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি Logo লন্ডনে গ্রেটার সিলেট কমিউনিটি ইউকের জাতীয় সম্মেলন সফল করার আহ্বান Logo চুনারুঘাটে ঘুষের ভিডিও ভাইরাল, এএসআই অতনু প্রত্যাহার Logo চুনারুঘাটে হাসপাতালে রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় জনমনে ক্ষোভ, তদন্ত কমিটি গঠন Logo চুনারুঘাটে চিকিৎসা অবহেলায় রোগীর মৃত্যুর অভিযোগ: হাসপাতাল পরিদর্শনে জামায়াত নেতারা Logo আমি পোশাক লাগিয়েছি ঘুষের টাকা দিয়ে, ঘুষ খাওয়ার জন্যই-এএসআই ইলিয়াছ Logo সৌদিতে নির্যাতনের শিকার গৃহবধূ রেহেনার দেশে ফেরার আকুতি Logo চুনারুঘাটে সাহিত্য-সংস্কৃতির উন্নয়নে সরকারের সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস
বর্ষায় কাদা-পানি পেরিয়ে প্রতিদিন স্কুলে যাতায়াত, দ্রুত বদলির দাবি

হুইলচেয়ারেই কাটে প্রধান শিক্ষক কল্যাণ কুমার দেবের জীবন

দুটি পা-ই অচল। চলাচলের একমাত্র অবলম্বন হুইলচেয়ার। সেই হুইলচেয়ারে ভর করেই বছরের পর বছর কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলছেন হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার বড়ব্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কল্যাণ কুমার দেব। তবে বর্ষা এলেই তাঁর শিক্ষকতার দায়িত্ব পালনের পথ হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। হাঁটুসমান কাদা, পিচ্ছিল কাঁচা রাস্তা ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্রিজ পেরিয়ে প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যেতে হয় তাঁকে। ফলে প্রতিটি কর্মদিবসই যেন তাঁর জন্য এক কঠিন সংগ্রাম।

কল্যাণ কুমার দেব ১৯৯৯ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে তিনি দক্ষতা, নিষ্ঠা ও মেধার পরিচয় দিয়েছেন। ২০১৩ সালে বড়ব্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ইংরেজি বিষয়ে দক্ষ ‘মাস্টার ট্রেইনার’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। চুনারুঘাট উপজেলার প্রায় সাড়ে সাতশ শিক্ষক-শিক্ষিকার মধ্যে একজন বিনয়ী, দক্ষ ও আদর্শ শিক্ষক হিসেবে তাঁর সুনাম রয়েছে।

কিন্তু ২০১৮ সালে একটি দুর্ঘটনায় ছাদ থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন তিনি। এরপর দীর্ঘদিন সিআরপিতে চিকিৎসা নিতে হয়। চিকিৎসায় জীবন রক্ষা পেলেও হারিয়ে ফেলেন দুই পায়ের স্বাভাবিক চলাচলের সক্ষমতা। সেই থেকে হুইলচেয়ারই তাঁর নিত্যদিনের সঙ্গী।

বর্তমানে তিনি উপজেলার আহমেদাবাদ ইউনিয়নের রাজার বাজার এলাকায় নিজ বাড়িতে বসবাস করেন। বাড়ি থেকে কর্মস্থল বড়ব্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দূরত্ব প্রায় তিন কিলোমিটার। স্বাভাবিক সময়েও পথটি তাঁর জন্য কঠিন। বর্ষা মৌসুমে কাঁচা রাস্তা কাদা-পানিতে একাকার হয়ে গেলে দুর্ভোগ বেড়ে যায় কয়েক গুণ। এর সঙ্গে রয়েছে পথে থাকা একটি ঝুঁকিপূর্ণ ব্রিজ। হুইলচেয়ার নিয়ে ব্রিজটি পার হওয়ার সময় যেকোনো মুহূর্তে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে।

প্রতিদিন প্রায় ৬ হাজার টাকা বেতন দিয়ে একজন সহকারী সঙ্গে নিয়ে এই দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হয় তাঁকে। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীদের পাঠদান থেকে কখনো পিছপা হননি তিনি। কিন্তু টানা বৃষ্টি ও কাদা-পানির মৌসুমে প্রতিদিনের এই যাতায়াত এখন তাঁর জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে অসহনীয় হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও শিক্ষকরা বলছেন, একজন অভিজ্ঞ ও দক্ষ শিক্ষককে শুধু কর্মস্থলে পৌঁছাতে প্রতিদিন এমন ঝুঁকি নিতে হচ্ছে—এটি অত্যন্ত মানবিক বিষয়। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাযুক্ত শিক্ষকদের জন্য সরকারি নীতিমালায় মানবিক বিবেচনায় বিশেষ সুবিধা ও বাড়ির কাছাকাছি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পদায়নের সুযোগ রয়েছে। তাই তাঁর শারীরিক অবস্থা ও যাতায়াতের দুর্ভোগ বিবেচনায় দ্রুত নিকটবর্তী কোনো বিদ্যালয়ে বদলি করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

স্থানীয়দের ভাষ্য, কল্যাণ কুমার দেবের মতো একজন অভিজ্ঞ ও দক্ষ শিক্ষককে তাঁর শারীরিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মপরিবেশ দেওয়া হলে তিনি আরও দীর্ঘদিন শিক্ষার্থীদের কল্যাণে অবদান রাখতে পারবেন। তাই মানবিক দিক বিবেচনা করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে—এমন প্রত্যাশা শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

খন্দকার আলাউদ্দিন

আপনাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, অনিয়ম, দুর্নীতি, অপরাধ, জনদুর্ভোগ, উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড ও সম্ভাবনার সংবাদ আমাদের জানান।
জনপ্রিয় সংবাদ

‘অবিচল বিশ্বাসের ৫০ বছর’ উদযাপনে হবিগঞ্জে র‍্যালি ও গ্রাহক সম্মেলন

বর্ষায় কাদা-পানি পেরিয়ে প্রতিদিন স্কুলে যাতায়াত, দ্রুত বদলির দাবি

হুইলচেয়ারেই কাটে প্রধান শিক্ষক কল্যাণ কুমার দেবের জীবন

আপডেট সময় ১০:৫০:০৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দুটি পা-ই অচল। চলাচলের একমাত্র অবলম্বন হুইলচেয়ার। সেই হুইলচেয়ারে ভর করেই বছরের পর বছর কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলছেন হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার বড়ব্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কল্যাণ কুমার দেব। তবে বর্ষা এলেই তাঁর শিক্ষকতার দায়িত্ব পালনের পথ হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। হাঁটুসমান কাদা, পিচ্ছিল কাঁচা রাস্তা ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্রিজ পেরিয়ে প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যেতে হয় তাঁকে। ফলে প্রতিটি কর্মদিবসই যেন তাঁর জন্য এক কঠিন সংগ্রাম।

কল্যাণ কুমার দেব ১৯৯৯ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে তিনি দক্ষতা, নিষ্ঠা ও মেধার পরিচয় দিয়েছেন। ২০১৩ সালে বড়ব্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ইংরেজি বিষয়ে দক্ষ ‘মাস্টার ট্রেইনার’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। চুনারুঘাট উপজেলার প্রায় সাড়ে সাতশ শিক্ষক-শিক্ষিকার মধ্যে একজন বিনয়ী, দক্ষ ও আদর্শ শিক্ষক হিসেবে তাঁর সুনাম রয়েছে।

কিন্তু ২০১৮ সালে একটি দুর্ঘটনায় ছাদ থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন তিনি। এরপর দীর্ঘদিন সিআরপিতে চিকিৎসা নিতে হয়। চিকিৎসায় জীবন রক্ষা পেলেও হারিয়ে ফেলেন দুই পায়ের স্বাভাবিক চলাচলের সক্ষমতা। সেই থেকে হুইলচেয়ারই তাঁর নিত্যদিনের সঙ্গী।

বর্তমানে তিনি উপজেলার আহমেদাবাদ ইউনিয়নের রাজার বাজার এলাকায় নিজ বাড়িতে বসবাস করেন। বাড়ি থেকে কর্মস্থল বড়ব্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দূরত্ব প্রায় তিন কিলোমিটার। স্বাভাবিক সময়েও পথটি তাঁর জন্য কঠিন। বর্ষা মৌসুমে কাঁচা রাস্তা কাদা-পানিতে একাকার হয়ে গেলে দুর্ভোগ বেড়ে যায় কয়েক গুণ। এর সঙ্গে রয়েছে পথে থাকা একটি ঝুঁকিপূর্ণ ব্রিজ। হুইলচেয়ার নিয়ে ব্রিজটি পার হওয়ার সময় যেকোনো মুহূর্তে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে।

প্রতিদিন প্রায় ৬ হাজার টাকা বেতন দিয়ে একজন সহকারী সঙ্গে নিয়ে এই দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হয় তাঁকে। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীদের পাঠদান থেকে কখনো পিছপা হননি তিনি। কিন্তু টানা বৃষ্টি ও কাদা-পানির মৌসুমে প্রতিদিনের এই যাতায়াত এখন তাঁর জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে অসহনীয় হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও শিক্ষকরা বলছেন, একজন অভিজ্ঞ ও দক্ষ শিক্ষককে শুধু কর্মস্থলে পৌঁছাতে প্রতিদিন এমন ঝুঁকি নিতে হচ্ছে—এটি অত্যন্ত মানবিক বিষয়। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাযুক্ত শিক্ষকদের জন্য সরকারি নীতিমালায় মানবিক বিবেচনায় বিশেষ সুবিধা ও বাড়ির কাছাকাছি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পদায়নের সুযোগ রয়েছে। তাই তাঁর শারীরিক অবস্থা ও যাতায়াতের দুর্ভোগ বিবেচনায় দ্রুত নিকটবর্তী কোনো বিদ্যালয়ে বদলি করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

স্থানীয়দের ভাষ্য, কল্যাণ কুমার দেবের মতো একজন অভিজ্ঞ ও দক্ষ শিক্ষককে তাঁর শারীরিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মপরিবেশ দেওয়া হলে তিনি আরও দীর্ঘদিন শিক্ষার্থীদের কল্যাণে অবদান রাখতে পারবেন। তাই মানবিক দিক বিবেচনা করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে—এমন প্রত্যাশা শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের।