প্রকৃতির অপরূপ দানে সমৃদ্ধ হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর ও চুনারুঘাট উপজেলা নিয়ে জাতীয় সংসদের ২৪২ নম্বর আসন হবিগঞ্জ–৪। সিপাহসালার সৈয়দ নাসির উদ্দিন (রহ.) ও ফতেহ গাজী রহমাতুল্লাহের পদধূলিতে ধন্য এ জনপদ যেন বিধাতার এক অনন্য সৃষ্টি।
রঘুনন্দন, রেমা, কালেঙ্গা, সাতছড়ির বনাঞ্চল, সবুজে মোড়া চা–বাগান, খনিজ ও বনজ সম্পদের অমূল্য ভান্ডার, কৃষি ও শিল্পের সমন্বয়ে গঠিত এমন অঞ্চল দেশের ব-দ্বীপে বিরল। অথচ এই প্রাচুর্যের মাঝেও রয়েছে দীর্ঘদিনের হাহাকার—যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতা, পরিবেশ ও প্রতিবেশ সংকট, উন্নয়ন নিয়ে সীমাহীন অভিযোগ এবং অতীত জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে আক্ষেপ। এমন বাস্তবতায় দ্বারপ্রান্তে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন।
২০১৪ ও ২০১৮ সালের মতো এবারও নয়—২০২৪ সাল ছিল ব্যতিক্রম। সারাদেশে যেখানে সমঝোতার নির্বাচন, সেখানে হবিগঞ্জ–৪ এর মানুষ সরকারি দল, প্রশাসন ও বাহিনীর চাপ উপেক্ষা করে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটযুদ্ধে অংশ নেয়।
প্রভাবশালী মন্ত্রী মাহবুব আলীর বিপরীতে নিজ কর্মগুণে পরিচিত ব্যারিস্টার সুমন সূচনা করেন এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের। চা–শ্রমিকরা ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নৌকার বিপরীতে ঈগল প্রতীকে ভোট দেয়। ফলাফল—লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে পরাজয় বরণ করেন প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী।
এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেই। নয়জন প্রার্থীর কথা শোনা গেলেও বাস্তব আলোচনায় আছেন মূলত তিনজন—বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সায়হাম শিল্পগোষ্ঠীর কর্ণধার ও জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ ফয়সাল, সুন্নি জামাতের ইসলামী বক্তা মাওলানা তাহেরী এবং খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় মহাসচিব ড. আহমদ আব্দুল কাদের।
চায়ের দোকানের আড্ডা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা সুধীজনের আলোচনায় ড. কাদেরের উপস্থিতি প্রায় অনুপস্থিত। অনেকের মতে, তাঁর জামানত রক্ষা করাই কঠিন হবে। আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন সৈয়দ ফয়সাল ও মাওলানা তাহেরী। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে এই দ্বিমুখী সমীকরণ কোন দিকে মোড় নেবে—সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।
স্বাধীনতার পর থেকে হবিগঞ্জ–৪ আসনটি আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। প্রতিটি নির্বাচনে চা–শ্রমিক ও সংখ্যালঘু ভোট ফলাফলের গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক ছিল। ৯১, ৯৬ ও ২০০১ সালের মতো বিতর্কহীন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতা এনামুল হক মোস্তফা শহীদ বিজয়ী হন, বিপরীতে শক্তিশালী বিএনপি প্রার্থী সৈয়দ ফয়সাল পরাজিত হন ১০ থেকে ২০ হাজার ভোটের ব্যবধানে।
কিন্তু এবার নৌকা নেই, ব্যারিস্টার সুমন কারাগারে। চা–শ্রমিকদের ভোট কোন দিকে যাবে—এটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। আওয়ামী অনুসারী ও সংখ্যালঘু ভোটারদের ভাবনাও বদলেছে।
এই অঞ্চলের রাজনীতিতে রয়েছে একটি ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য—একটি পরিবারের দীর্ঘ রাজনৈতিক ঐতিহ্য। স্বাধীনতা–পূর্বকাল থেকে নোয়াপাড়ার ‘সৈয়দ পরিবার’ রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। আশির দশকে সায়হাম টেক্সটাইল প্রতিষ্ঠার পর পরিবারটি ‘সায়হাম পরিবার’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে এ পরিবার অঞ্চলটির সামাজিক ও অর্থনৈতিক চিত্র বদলে দেয়। পাহাড়ি শ্রমিক ও কৃষিনির্ভর অর্থনীতি শিল্পনির্ভর কাঠামোয় রূপ নেয়। এই রূপান্তরের পেছনে যাঁর ভূমিকা সবচেয়ে বেশি, তিনি সৈয়দ মোহাম্মদ ফয়সাল—চতুর্থবারের মতো বিএনপি মনোনীত প্রার্থী।
প্রতিটি গ্রামে তাঁদের নিজস্ব সমর্থকগোষ্ঠী রয়েছে। দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে বংশানুক্রমিক এই সমর্থনই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। দুর্যোগ, বিরোধ কিংবা সামাজিক সমস্যায় মানুষ এখনো সায়হাম পরিবারের দ্বারস্থ হয়।
দুর্নীতির অভিযোগে জর্জরিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সৈয়দ ফয়সালকে ঘিরে তেমন অভিযোগ নেই—এটাই তাঁর বড় শক্তি। ক্লিন ইমেজের প্রার্থী হিসেবে তিনি বাড়তি সুবিধায় আছেন।
চা–শ্রমিক ইউনিয়নের এক নেতা বলেন, “শ্রমিকরা ভোটকেন্দ্রে গেলে বিকল্প না থাকায় ৯০ শতাংশ ভোট সৈয়দ ফয়সালই পাবেন।” সংখ্যালঘু ভোটারদের মাঝেও ভিন্ন কোনো প্রবণতা দেখা যাচ্ছে না।
অন্যদিকে, মাওলানা তাহেরী ধর্মীয় বক্তা হিসেবে পরিচিত হলেও এই এলাকার মানুষের সঙ্গে তাঁর শেকড় নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা থাকলেও মাঠের রাজনীতিতে তাঁর অবস্থান দুর্বল—এমনটাই মনে করেন সচেতন ভোটাররা।
বর্ষীয়ান শিল্পপতি সৈয়দ ফয়সাল দীর্ঘদিন শিক্ষা, শিল্প ও মানবিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থেকেও বারবার নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন। সেই ব্যর্থতাই এবার তাঁর প্রতি ভোটারদের সহানুভূতিতে রূপ নিয়েছে।
সব দিক বিবেচনায়, এবারের নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার ক্ষেত্রে সৈয়দ মোহাম্মদ ফয়সালই সম্ভাবনার শীর্ষে। ধানের শীষের পাল্লা ভারী—এমন আলামতই স্পষ্ট হয়ে উঠছে হবিগঞ্জ–৪ আসনের নির্বাচনী সমীকরণে।
লেখক: কলামিস্ট ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষক
নিজস্ব প্রতিবেদক: 









