বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে মাধবপুর উপজেলার রয়েছে এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। প্রকৃতপক্ষে সুসংগঠিত মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয় এই উপজেলা থেকেই। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৪ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো প্রকৃত ইতিহাস থেকে বঞ্চিত দেশের মানুষ।
অভিযোগ আছে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন ব্যাক্তি ও গোষ্ঠীর হস্তক্ষেপে স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধবপুর উপজেলার ইতিহাসে ব্যাপক বিকৃত ঘটানো হয়েছে।
এমনই দুটি ঘটনা দেখা যায় মাধবপুর থানার ভেতরে ও তেলিয়াপাড়া স্মৃতিসৌধে লাগানো দুটি ফলকে। বিষয়টি নিয়ে দিনদিন বাড়ছে জন-অসন্তোষ।মুক্তিযোদ্ধা এডঃ মোহাম্মদ আলী পাঠান এর তথ্যের ভিত্তিতে মাধবপুর থানায় একটি ফলক উন্মোচন করেন তৎকালীন পুলিশ সুপার হবিগঞ্জ জয়দেব কুমার ভদ্র।
ফলকে লেখা হয়েছে, “১৩ মার্চ ১৯৭১ তারিখ মাধবপুর থানার ওসি মুসলেউদ্দিন খান এর কাছ থেকে ১৩ টি রাইফেল, ২০০০ রাউন্ড গুলি জি, ডি মূলে গ্রহণ করেন, মৌলানা আছাদ আলী এম.পি.এ এবং স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক মোহাম্মদ আলী পাঠান।
পুলিশের সদস্যগণ স্বেচ্ছা সেবকগণকে প্রশিক্ষণ প্রদান করে। ২৬শে মার্চ মাধবপুর থানার ওসি সহ সকল পুলিশ সদস্য বিদ্রোহ ঘোষনা করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন।
২৭ এপ্রিল মাধবপুরের বৃহত্তর প্রতিরোধ যুদ্ধে মাধবপুর থানার পুলিশের বীরত্বপূর্ণ ভুমিকা প্রশংশনীয়।” অথচ মোহাম্মদ আলী পাঠান হবিগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ড এর ইউনিট কমান্ডার থাকা অবস্থায় তার তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত মুহম্মদ সায়েদুর রহমান তালুকদার এর লেখা “মুক্তিযুদ্ধে মাধবপুর” বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরী মাধবপুর এসে স্থানীয় নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনা করেন।
অতঃপর মৌলানা আছাদ আলী, মোহাম্মদ আলী পাঠান প্রমুখ নেতৃবৃন্দকে নিয়ে মাধবপুর থানায় যাবার পর ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুসলেম উদ্দিন খান মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে তার অবস্থান ঘোষণা করতঃ থানার ১২টি রাইফেলসহ ১২ জন সিপাইকে মানিক চৌধুরীর সাথে প্রেরণ করেন।
এ সময়ে মাধবপুর থানা এলাকা থেকে শুরু করে চা বাগান পর্যন্ত ছাত্র-জনতা ও চা শ্রমিকরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে প্রতিরোধের জন্য রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড সৃষ্টি করে শত্রুদের আগমনের প্রত্যাশায় প্রহর গুনতে থাকে।
এ পর্যায়ে চা শ্রমিকদের ভূমিকার কথা না বললেই নয়। মানিক চৌধুরীর দিক নির্দেশনায় সে সময়ে প্রতিটি চা বাগানেই তীরন্দাজ বাহিনী গঠিত হয়। ওরা নিজেদের কাজ ফেলে বাঙালি সমাজের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রতিরোধ আন্দোলনে শরিক হয়।
মুক্তিযুদ্ধ কালে তাদের ভূমিকা প্রশংসার দাবি রাখে। ঢাকা-সিলেট সড়ক পথের বিভিন্ন স্থানে গাছ-পালা, পাথর ইত্যাদি ফেলে ব্যারিকেড সৃষ্টি করা হয়। মাধবপুরে প্রথম ব্যূহ রচনার ব্যাপারে কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরী বলেন: ‘মাধবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত অফিসার আমাকে সাহায্য করেছিলেন।
তার হাতে যত অস্ত্র, যত পুলিশ ছিল সম্পূর্ণভাবে আমার হাতে অর্পণ করে দিয়ে আমারই নির্দেশে পরিচালিত হবে এই নির্দেশে যে ১২ জন কনস্টেবল ছিল ১২টি রাইফেল ছিল তা নিয়ে মাধবপুরে প্রথম ব্যূহ রচনা করেছিলাম।
এই বইয়ে ৭১ সালের ৪ঠা এপ্রিল তেলিয়াপাড়ায় অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক সভায় উপস্থিতি নিয়ে লেখা হয়েছে, “সভার উপস্থিতি নিয়ে সামান্য মতভিন্নতা দেখা যায়।
বিভিন্ন সূত্র মতে ঐতিহাসিক এ সভায় কর্নেল (অবঃ) এম এ জি ওসমানী এমএনএ, লেঃ কর্নেল (অবঃ) এম এ রব এমএনএ, লেঃ কর্নেল সালাউদ্দীন মোহাম্মদ রেজা, মেজর খালেদ মোশাররফ, মেজর কে এম সফিউল্লাহ, মেজর জিয়াউর রহমান, মেজর কাজী নুরুজ্জামান, মেজর নুরুল ইসলাম, মেজর শাফায়াত জামিল, মেজর মঈনুল হোসেন চৌধুরী, এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিদ্রোহী মহকুমা প্রশাসক কাজী রকিব উদ্দিন উপস্থিত ছিলেন।
ভারত সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে বিএসএফ’র পূর্বাঞ্চলীয় মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার ভি সি পাণ্ডে ও আগরতলার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ওমেস সায়গল উপস্থিত ছিলেন।উক্ত সভার উপস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে মেজর জেনারেল কে এম সফিউল্লাহ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিদ্রোহী মহকুমা প্রশাসক কাজী রকিব উদ্দিনের উপস্থিতি স্বীকার করেননি।
তিনি জানান যে, বেসামরিক ব্যক্তির মধ্যে কেবলমাত্র কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরী ঐ সভায় উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু মানিক চৌধুরী তখন শেরপুর যুদ্ধে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন বলে এ তথ্যটি গ্রহণ করা যায় না।”
মেজর জেনারেল কে.এম. সফিউল্লাহ বীর উত্তম তার মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ বইয়ে ৪ঠা এপ্রিলের ঐতিহাসিক সভার বর্ণনা দিতে গিয়ে লেখেন,”৪ এপ্রিল হচ্ছে একটি স্মরণীয় দিন।
তেলিয়াপাড়ায় বহু উচ্চপদস্থ অফিসারের আগমন ঘটে। কর্নেল এম এ জি ওসমানী, লেঃ কর্নেল আবদুর রব, লেঃ কর্নেল সালেহউদ্দিন মোহাম্মদ রেজা, মেজর কাজী নূরুজ্জামান, মেজর খালেদ মোশাররফ, মেজর নূরুল ইসলাম, মেজর শাফায়াত জামিল, মেজর মঈনুল হোসেন চৌধুরী এবং অন্যান্যরা আগমনের ফলে আমার ক্ষুদ্র সদর দফতর আনন্দ-উত্তেজনায় ভরে ওঠে। আমি সবাইকে সাদর সম্ভাষণ জানাই।
” এই দুটো বইয়ে ৪ ঠা এপ্রিলের সভায় কোন বেসামরিক লোকজনের উপস্থিত থাকার কথা উল্লেখ না থাকলেও তেলিয়াপাড়া স্মৃতিসৌধ এলাকায় বিপুল সংখ্যক বেসামরিক লোকজন উপস্থিত ছিলেন বলে নাম ফলক লাগানো রয়েছে।
এব্যাপারে মুক্তিযুদ্ধে মাধবপুর বইয়ের লেখক মুহম্মদ সায়েদুর রহমান তালুকদার বলেন, “মুক্তিযুদ্ধা সংসদ হবিগঞ্জ জেলা ইউনিট কমান্ডার মোহাম্মদ আলী পাঠান সাহেব মাধবপুর থানায় যে ফলকটি লাগান তার নোট আমাকে দেখিয়েছিলেন।
আমি কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরীর রেফারেন্স দিয়ে আপত্তি জানালে তিনি তার প্রমাণ চান। তখন যুগভেরী পত্রিকায় ২৪ মার্চ’৭২ তারিখে প্রকাশিত মানিক চৌধুরীর দীর্ঘ লেখাটি দেখাই।
তিনি তা পড়ে উত্তর দেন মানিক চৌধুরী মিথ্যা বলেছেন। তাছাড়া সদরের এমপি আবু জাহিরও তাকে পছন্দ করেন না। তেলিয়াপাড়া স্মৃতিসৌধের ফলকেও তিনি অনেক বিকৃতির আশ্রয় নিয়েছেন।
এ ব্যাপারেও আমি আপত্তি জানিয়েছিলাম। পাঠান সাহেব তৎকালীন সমাজকল্যাণ মন্ত্রী মোস্তফা শহীদ সাহেবসহ কারো কারো সাথে পরামর্শ করে নাকি এই তালিকা প্রণয়ন করেছেন বলে জানান। তা সত্ত্বেও আমার ‘মুক্তিযুদ্ধে মাধবপুর’ গ্রন্থে এই বিকৃতির বিষয়ে গুরুত্বসহ আলোকপাত করেছি। আমার তথ্য প্রমাণ মেনে নিয়েই তিনি হবিগঞ্জ জেলা কমান্ড থেকে বইটি প্রকাশ করেছিলেন।
এসব বিষয় ইউপিএল থেকে প্রকাশিত আমার তেলিয়াপাড়া বিষয়ক গবেষণা গ্রন্থ ‘মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিসাক্ষী তেলিয়াপাড়া’তেও তথ্যপ্রমাণ সহ আলোচনা করেছি।”
মাধবপুর উপজেলা বিএনপির সেক্রেটারি হামিদুর রহমান হামদু বলেন, বিগত স্বৈরাচার সরকারের সময়ে ইতিহাস বিকৃতি অনেক হয়েছে, এবার এটা বন্ধ করতে হবে। নতুন প্রজন্মের কাছে সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার এখনি সময়।
উপজেলা বিএনপির সহ সভাপতি ও ইউপি চেয়ারম্যান মো: পারভেজ হোসেন চৌধুরী বলেন, বিগত সরকারের আমলে মোহাম্মদ আলী পাঠান ইচ্ছেমতো মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি করেছে।
ইতিহাস বিকৃতির ঘটনায় দিনদিন জন-অসন্তোষ বাড়ছে। তাই দ্রুত সময়ের মধ্যে এসব বিকৃত ইতিহাস লেখা ফলক গুলো অপসারণ করে সঠিক ইতিহাস লেখা ফলক প্রতিস্থাপন করা প্রয়োজন।